কলকাতা: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা। একদিকে গেরুয়া শিবিরের ক্রমবর্ধমান দাপট, অন্যদিকে তৃণমূলের ‘ডাকাবুকো’ নেতা জাহাঙ্গির খানের (Jahangir Khan) অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আগামী ২১ মে ফলতায় পুনর্নির্বাচন। আর তার ঠিক আগেই আইনি রক্ষাকবচ পেতে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হলেন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান (Jahangir Khan) । তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে তাঁকে পর্যুদস্ত করতে একাধিক ‘মিথ্যা’ এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং পুনর্নির্বাচনের আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করে তাঁর মনোবল ভেঙে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে।
জাহাঙ্গির (Jahangir Khan) বনাম শুভেন্দু (Suvendu Adhikari) : ফলতায় টক্কর তুঙ্গে
গত শনিবার ফলতায় এক মেগা জনসভা করেন রাজ্যের নয়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। সেখান থেকেই সরাসরি জাহাঙ্গির খানকে নিশানা করেন তিনি। শুভেন্দু অধিকারীর হুঙ্কার ছিল, “কোথায় পুষ্পা, দেখা পাওয়া যাচ্ছে না কেন? এবার কাউকে অশান্তি করতে দেওয়া হবে না।” তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, ২০২১ সালের ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যে ১৯ জন ‘কুখ্যাত অপরাধী’র তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেখানে জাহাঙ্গির খানের (Jahangir Khan) নাম ছিল। শুভেন্দুর এই কড়া বার্তার পরই কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েন জাহাঙ্গির (Jahangir Khan) ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দুর এই ‘অ্যাকশন’ নেওয়ার হুঁশিয়ারির পরই তড়িঘড়ি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তৃণমূল প্রার্থী। তাঁর এই পদক্ষেপকে অনেকেই রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন।
‘পুষ্পা ঝুঁকেগা নেহি’ থেকে রক্ষাকবচের আর্জি
নির্বাচনের শুরু থেকেই জাহাঙ্গির খান ছিলেন চর্চার কেন্দ্রে। ফলতায় যখন উত্তরপ্রদেশের দুঁদে পুলিশ আধিকারিক তথা ‘সিংহম’ অজয় পাল শর্মাকে পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠায় নির্বাচন কমিশন, তখন জাহাঙ্গির চড়া সুরে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন। সেই সময় অল্লু অর্জুনের সিনেমার সংলাপ আউড়ে তিনি বলেছিলেন, “পুষ্পা ঝুঁকেগা নেহি।”
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই দাপট অনেকটাই স্তিমিত। গেরুয়া ঝড়ে রাজ্যের শাসক শিবিরের আসন যখন টলমল, তখন জাহাঙ্গির নিজেকে ‘গৃহবন্দি’ করে ফেলেছিলেন বলে বিরোধীদের দাবি। ১৫ মে তাঁকে আবার প্রকাশ্যে দেখা গেলেও, শুভেন্দুর হুঁশিয়ারি তাঁর ওপর চাপ বাড়িয়েছে বহুগুণ।
হাই কোর্টে মামলার গতিপ্রকৃতি
সোমবার সকালে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে জাহাঙ্গির খানের আইনজীবী দ্রুত শুনানির আবেদন জানান। তাঁদের দাবি:
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে একাধিক ভুয়ো মামলা দেওয়া হয়েছে।
ভোটে প্রার্থীকে প্রচার থেকে দূরে রাখতে এবং কর্মীদের মনোবল ভাঙতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে প্রার্থীর গ্রেপ্তারির ওপর স্থগিতাদেশ প্রয়োজন।
আদালত সূত্রে খবর, সোমবার দুপুর ২টো নাগাদ এই মামলার শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, হাই কোর্ট তাঁকে রক্ষাকবচ দেয় কি না।
ফলতার পুনর্নির্বাচন: চ্যালেঞ্জের মুখে তৃণমূল
২৯ এপ্রিল ফলতায় ভোটগ্রহণ হলেও বিভিন্ন অভিযোগে নির্বাচন কমিশন তা বাতিল করে। আগামী ২১ মে পুনর্নির্বাচন এবং ২৪ মে ফলপ্রকাশ। এই পুনর্নির্বাচন তৃণমূলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ কারণ:
শুভেন্দুর প্রভাব: মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) যে চড়া মেজাজে আক্রমণ শানাচ্ছেন, তাতে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে।
কমিশনের কড়াকড়ি: অজয় পাল শর্মার (Ajay Pal Sharma) মতো দুঁদে আধিকারিকদের নজরদারিতে এবার ফলতায় ছাপ্পা ভোট বা অশান্তি রুখতে কমিশন বদ্ধপরিকর।
জাহাঙ্গিরের ইমেজ: মানবাধিকার কমিশনের তালিকায় নাম থাকা এবং দুর্নীতির অভিযোগ জাহাঙ্গির খানের ভাবমূর্তিতে আঘাত হেনেছে।
ফলতার মানুষ কি এবার জাহাঙ্গিরের ওপর ভরসা রাখবেন? জাহাঙ্গির নিজে দাবি করেছেন, “ফলতার মানুষের উপর বিশ্বাস রয়েছে। মানুষ যা রায় দেবেন, সেই রায় মাথা পেতে নেব।” কিন্তু বাস্তবের চিত্রটা যে অতটা সহজ নয়, তা তিনি নিজেও হয়তো বুঝতে পারছেন। তাই তো ‘পুষ্পা’ স্টাইল ছেড়ে এখন আইনের রক্ষাকবচই তাঁর শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার দুপুরে কলকাতা হাই কোর্ট জাহাঙ্গির খানকে অন্তর্বর্তীকালীন স্বস্তি দেয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।